প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের ইতিহাস
ক) মৌর্য সাম্রাজ্য
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সামৃরাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্যচন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪-৩০০ অব্দ)
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধের সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতের প্রথম সম্রাট। পাটলিপুত্র ছিল তাঁর রাজধানী। চাণক্য ছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী।
চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য' যা তিনি তাঁর বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্ধ 'অর্থশাস্ত্র' এ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিকৌশলের সার সংক্ষেপ এই অর্থশাস্ত্র।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে উপমহাদেশ হতে গ্রিকদের তাড়িয়ে দেন।
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৮-২৩২ অব্দ)
মৌর্য বংশের তৃতীয় সম্রাট হলেন সম্রাট অশোক। উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে। অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। মহাস্থানগড়ে সম্রাট অশোকের একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। 'কলিঙ্গ যুদ্ধ' সম্রাট অশোকের জীবনে এক মাইলস্টোন। কলিঙ্গ যুদ্ধে কলিঙ্গ রাজ সম্পূর্ণ পরাজিত হন এবং এক লক্ষ লোক নিহত হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তস্রোত অশোকের মনে গভীর বেদনার রেখাপাত করে। তখন কৃতকর্মের অনুশোচনায় মূহ্যমান অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম রাজধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর চেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বধর্মের মর্যাদা পায়। এজন্য তাঁকে 'বৌদ্ধ ধর্মের কনস্ট্যানটাইন' বলা হয়।
খ) কুষাণ সাম্রাজ্য
রাজা কনিঙ্ক
রাজা কনিঙ্ক ছিলেন কুষাণ রাজাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর চিকিৎসক ছিলেন চরক। চরক আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির সর্বপ্রথম সংকলনগ্রন্থ রচনা করেন যা 'চরক সংহিতা' নামে সমধিক পরিচিত।
গ) গুপ্ত সাম্রাজ্য
ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগ সামগ্রিকভাবে 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে খ্যাত।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.)
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন ভারতে গুপ্তবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৩২০ সালে পাটলিপুত্রের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০ খ্রি.)
প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন সমুদ্রগুপ্ত। তিনি ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁকে 'প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ান' বলা হয়। তা্র আমলে সমতট ছাড়া বাংলার অন্যান্য জনপদ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। গুপ্ত অধিকৃত বাংলার রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫ খ্রি.)
সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। তিনি মালবের উজ্জয়িনীতে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। 'বিক্রমাদিত্য' ছিল তাঁর উপাধি। তাঁর শাসনামলে গুপ্ত সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়। অনেক প্রতিভাবান ও গুণী ব্যক্তি বিক্রম দরবারে সমবেত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে প্রধান নয়জনকে 'নবরত্ন' বলা হয়। যথা- কালিদাস, অমরসিংহ, বরাহমিহির,..... প্রমুখ।
মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। তাঁর রচনাবলির মধ্যে অভিজ্ঞানশকুন্তল, বিক্রমোর্বশীয় এবং মালবিকাগ্নিমিত্র নাটক, রঘুবংশ ও কুমারসম্ভব মহাকাব্য এবং মেঘদূত ও ঋতুসংহার গীতিকাব্য সাহিত্যমাধুর্যে অতুলনীয়।
অমরসিংহ ছিলেন সংস্কৃত কবি, ব্যাকরণবিদ এবং প্রাচীন ভারতের সর্বশেষ্ঠ অভিধান প্রণেতা। তাঁর প্রসিদ্ধ সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ'।
বরাহমিহির ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্ধ 'বৃহৎ সংহিতা'।
৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতি হুনদের আক্রমণে টুকরো টুকরো হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য।
স্বাধীন বঙ্গ ও গৌড় রাজ্য
গুপ্তবংশের পতনের পর খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে বাংলায় দুটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয় যথা- বঙ্গ রাজ্য ও গৌড় রাজ্য।
বঙ্গ রাজ্য
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম-বাংলার দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে ছিল বঙ্গ রাজ্যের অবস্থান। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব নামে তিনজন রাজা 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্য শাসন করতেন।
গৌড় রাজ্য
বাংলার পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল ছিল গৌড় রাজ্যের অবস্থান। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোন অঞ্চলের শাসনকর্তাকে বলা হত 'মহাসামন্ত'। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন মহাসামন্ত। শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে গৌড় অঞ্চলল ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে গৌড় নামে একত্রিত করেন। শশাঙ্কের উপাধি ছিল রাজাধিরাজ। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা। শশাঙ্ক রাজধানী স্থাপন করেন কর্ণসুবর্ণে। এটি ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়।
পুষ্যভূতি রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এদের মধ্যে বর্তমান পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে পুষ্যভূতি রাজ্যের অভ্যুদয় অন্যতম।
হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রি.)
পুষ্যভূতি বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন হর্ষবর্ধন। হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন বানভট্ট। বানভট্টের বিখ্যাত গ্রন্থ 'হর্ষচরিত'।
Comments