বাংলায় মুগল শাসনের ইতিহাস
বাংলায় মুগল বিজয়ের সূত্রপাত ঘটে সম্রাট হুমায়নের রাজত্বকালে। ১৫৩৮ সালে সম্রাট হুমায়ন বাংলায় প্রবেশ করেন এবং গৌড় অধিকার করেন। তিনি গৌড় নগরীর নাম পরিবর্তন করে 'জান্নাতাবাদ' রাখেন। বাংলায় আটমাস অবস্থান করে হুমায়ন দিল্লির দিকে যাত্রা করলে বক্সারের নিকটবর্তী চৌসা নামক স্থানে শেরশাহ তাঁকে অতর্কিত আক্রমণ করে। চৌসারের যুদ্ধে (১৫৩৯ সাল) পরাজিত হয়ে হুমায়ন কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে দিল্লি পৌচেন। হুমায়নের বাংলা,অধিকার তাই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
১৫৭৬ সালে সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান-ই-জাহান কুলী বেগ কররানী বংশের শেষ সুলতান দাউদ খান কররানীকে রাজমহলের যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলায় মুগল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাকে মুগল সাম্রাজ্যের একটি সুবাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সুবাহ হলো মুগল সামৃরাজ্যের প্রদেশ। সুবা বাংলার অন্তর্গত ছিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা। সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলায় মুগল শাসনের সূত্রপাত হলেও সমগ্র বাংলার ওপর মুগল আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। বারো ভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় মুগল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্রাট জাহাঙ্গীরের অন্যতম কৃতিত্ব।
সবাদারী ও নবাবী এ দু পর্বে বাংলায় মুগল শাসনকাল অতিবাহিত হয়।
ক) বাংলায় সুবাদারী শাসন
১) সুবাদার ইসলাম খান ( ১৬০৮-১৬১৩ খ্রি.)
সুবাদদার ইসলাম খানের সময় মুগল সম্রাট ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। ইসলাম খান বারো ভূ্ইয়াদের দমন করে বাংলায় সুবাদারী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ১৬১০ সালে সুবা বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে তিনি ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। তিনি ঢাকার ঢোলাই খাল খনন করেন।
২) সুবাদার কাসিম খান জুয়িনী (১৬২৮-১৬৩২ খ্রি.)
সুবাদার কাসিম খান জুয়িনীর সময় মুগল সম্রাট ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। পর্তুগিজদের অত্যাচারের মাত্রা চরমে উঠলে সম্রাট শাহজাহান তাদেরকে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশে বাংলার সুবাদার কাসিম খান পর্তুগিজদের হুগলি থেকে উচ্ছেদ করেন।
৩) সুবাদার যুবরাজ শাহ সুজা
সুবাদার যুবরাজ শাহ সুজার সময় মুগল সম্রাট ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সুবাদার শাহ সুজা মুগল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।
৪) সুবাদার মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩ খ্রি.)
সুবাদার মীর জুমলার সময় মুগল সম্রাট ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। মীর জুমলা ঢাকা গেট (অন্য নাম রমনা গেট) নির্মাণ করেন। গেটটি কার্জন হলের কাছাকাছি ও পুরাতন হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিমে ময়মনসিংহ রোডে অবস্থিত। মীর জুমলা আসাম যুদ্ধে যে কামান ব্যবহার করেন তা বর্তমানে ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত আছে।
৫) সুবাদার শায়েস্তা খান
সুবাদার শায়েস্তা খানের সময় মুগল সম্রাট ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। শায়েস্তা খান দ'দফায় মোট ২২ বছর বাংলা শাসন করেন। প্রথমে ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ সাল এবং দ্বিতীয়বার ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত। তিনি চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ দখল করেন। তিনি চট্টগ্রামের নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'। তিনি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করেন। সুবাদার শায়েস্তা খান স্থাপত্য শিল্পের জন্য বিশেষ বিখ্যাত। স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য এই যুগকে বাংলায় মুগলদের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার ও ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ট এর বিবরনী থেকে জানা যায় শায়েস্তা খানের সময়ে দ্রব্যমূল্যের দাম এতো সস্তা ছিল যে, এক টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।
খ) বাংলায় নবাবী শাসন
১) নবাব মুর্শিদকুলী খান (১৭১৭-১৭২৭ খ্রি.)
সুবাদার মুর্শিদকুলী খানের সময় থেকে বাংলা সুবা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে। নবাব মুর্শিদকুলী খান বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। নবাব মুর্শিদকুলী খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তিনি বাংলার বিশৃঙ্খল রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন করেন। তাঁর রাজস্ব ব্যবস্থা 'মাল জামিনি' নামে পরিচিত।
২) নবাব সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি.)
নবাব মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খান বাংলার মসনদে বসেন।
৩) নবাব সরফরাজ খান (১৭৩৯-১৭৪০ খ্রি.)
সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খান 'আলা-উদ-দৌলা হায়দার জঙ্গ' উপাধি ধারণ করে বাংলার মসনদে বসেন।
৪) নবাব বলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.)
আলীবর্দী খানের শাসনামলে মারাঠারা (লণ্ঠনপ্রিয় মহারাষ্ট্রীয় সৈন্যদল) প্রতিবছর বাংলা, বিহার ও উড়িষয়স আক্রমণ করত। বাংলায় মারাঠা আক্রমণকারীরা 'বর্গী' (ফারসি শব্দ) নামে পরিচিত ছিল। মারাঠা বাহিনীর সাধারণ সৈনদের সর্বনিম্ন পদধারীদের বলা হতো বরগির। মারাঠাদের আক্রমণকে বাংলার ইতিহাসে বর্গীর হাঙ্গামা বলা হয়। আলীবর্দী খান মারাঠাদের সাথে চুক্তি করে বাংলাকে মারাঠাদের আক্রমণ হতে রক্ষা করেন।
৫) নবাব সিরাজ-উ-দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭ খ্রি.)
আলীবর্দী খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। ছোট মেয়ে আমেনার বিবাহ হয় জৈনুদ্দিন আহমদ খানের সাথে। তা্দের সন্তান সিরাজ-উদ-দৌলাকে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। সিরাজউদ্দোলার প্রকৃত নাম মীর্জা মুহম্মদ। তিনি ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। সিংহাসন লাভ করায় তার বড় খালা ঘষেটি বেগম এবং দরবারের প্রভাবশালীগণ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ইংরেজগণ এ ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযানঃ ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতায় ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করেন। কলকাতা অধিকার করে সিরাজউদ্দৌলা নিজ মাতামহের নামানুসারে এর নাম রাখেন আলীনগর।
অন্ধকূপ হত্যা কাহিনীঃ নবাবের কলকাতা অভিযান প্রাক্কালে হলওয়েলসহ কতিপয় ইংরেজ কর্মচারী ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দি হয়েছিলেন। ইংরেজ সেনাপতি হলওয়েলের বর্ণনা মতে জানা যায় যে, নবাব ১৪৬ জন ইউরোপীয় ও ইংরেজ বন্দিকে একটি ক্ষুদ্র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখেন। জুন মাসে প্রচণ্ড গরমে ক্ষুদ্র পরিসরে ১৪৬ জন বন্দির মধ্যে ১২৩ জন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত এই কাহিনী 'অন্ধকূপ হত্যা' নামে পরিচিত। অন্ধকূপ হত্যা কাহিনীর পশ্চাতে কোন ঐতিহাসিক সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
পলাশীর যুদ্ধঃ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নবাবের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ যুদ্ধ। যুদ্ধেক্ষেত্রে নবাবের প্রধান সেনাপতি মূরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, ইয়ারলতিফ, উমিচাঁদ প্রমুখ তাদের সৈনবাহিনীসহ নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও মীরমদন, মোহনলাল প্রমুখ দেশপ্রেমিক সৈনিকগণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেন। মীরমদন, মোহনলাল ইংরেজদের উপর কঠিন আঘাত হেনে বিপর্যস্ত করে পলাশীর
Comments