বাংলায় পরিব্রাজকদের আগমন

পরিব্রাজক
পরিব্রাজক হলো পর্যটক। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনে পরিব্রাজকদের বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

মেগাস্থিনিস
মেগাস্থিনিস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন পরিব্রাজক। গ্রিক সেলিউকাস খ্রিষ্টপূর্ব ৩০২ অব্দে মেগাস্থিনিসকে দূত হিসেবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে প্রেরণ করেন। তিনি কয়েক বছর এদেশে অবস্থান করে মৌর্য শাসন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা 'ইন্ডিকা' নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন।

ফা-হিয়েন
ফা-হিয়েন ছিলেন একজন তীর্থযাত্রী। তিনি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। চৈনিক পরিব্রাজকদের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতে আসেন। ফা-হিয়েন ৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে চীন থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৪ বছর পর আবার চীনে ফিরে যান। ভারত ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে তিনি সীমান্ত রাজ্য চম্পার মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে 'ফু-কুয়ো-কিং' বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

হিউয়েন সাং
হিউয়েন সাং ছিলেন একজন চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী। তিনি ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সফরে আসেন। তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ভারতে অবস্থান করেন। হর্ষবর্ধনের দরবারে তিনি আট বছর (৬৩৫-৬৪৩ খ্রি.) কাটান। হিউয়েন সাং নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শীলভদ্রের কাছে বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি 'সিদ্ধি' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। হিউয়েন সাং বাংলার কর্ণসুবর্ণের নিকটবর্তী রক্তমৃত্তিকা, পুণ্ড্রনগর, সমতট, তাম্রলিপ্তি ও কামরূপ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। 

ইবনে বতুতা
ইবনে বতুতা ১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে ২১ বছর বয়সে বিশ্ব সফরে বের হন। ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি সিন্ধুর পাঞ্জাবে (ভারতবর্ষ) পৌঁছান। ১৩৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দিল্লিতে আসেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলক তাঁকে দিল্লির কাজী নিযুক্ত করেন। প্রায় আট বছর তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ইবনে বতুতা ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বকালে বাংলায় আসেন। বাংলার যে শহরে ইবনে বতুতা প্রথম পৌঁছান (৯ জুলাই, ১৩৪৬) তার নাম তিনি উল্লেখ করেন চাটগাঁও (চট্টগ্রাম)। এরপর তিনি বিখ্যাত সুফিসাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে সিলেটে যান। তিনি সিলেট থেকে নদী পথে সোনারগাঁও (১৪ আগস্ট, ১৩৪৬) আসেন। ইবনে বতুতার 'কিতাবুল রেহেলা' (বা সফরনামা) নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম বিদেশি পর্যটক হিসেবে তিনি "বাঙ্গালা" শব্দ ব্যবহার করেন। জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদির প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী ইবনে বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এদেশের আবহাওয়া তাঁর পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলাদেশের নামকরণ করেন 'দোযখ ই পুর নিয়ামত' বা প্রাচুর্যপূর্ণ নরক।

মা-হুয়ান
মা-হুয়ান ছিলেন একজন চৈনিক পরিব্রাজক। তিনি গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে ১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দে চৈনিক এক প্রতিনিধি দলের দোভাষী হিসেবে বাংলায় আসেন। মা হুয়ান সোনারগাঁওকে একটি বিরাট বাণিজ্যিক শহররূপে প্রত্যক্ষ করেন। বাংলা সম্পর্কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ 'ইং ইয়াই শেং লান' নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন।

এক নজরে উপমহাদেশে পরিব্রাজকদের আগমনকাল

পরিব্রাজকদের নাম দেশ ভারতে আগমন বাংলায় আগমন
মেগাস্থিনিস গ্রিস খ্রিষ্টপূর্ব ৩০২ ×
ফা-হিয়েন চীন পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধে (৪০১-৪১০)
হিউয়েন সাং চীন ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ
ইবনে বতুতা মরক্কো ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দ ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দ
মা হুয়ান চীন ১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দ

Comments